শহরের একটা প্রাচীন গির্জায়, যেখানে দেখা যাচ্ছে মহিলারা মাথায় ঘোমটা দিয়ে প্রার্থনা করছেন। গির্জায় মহিলাদের মাথায় ঘোমটা? এটা কী কোন গির্জা নাকি মন্দির? নাকি আমরা ভুল দেখছি? না না আমরা ঠিকই দেখছি। কারণ বাইবেলে সাধু পৌল লিখেছেন “ভাল, স্ত্রী যদি মস্তক আবৃত না রাখে, সে চুলও কাটিয়া ফেলুক; কিন্তু চুল কাটিয়া ফেলা কি মস্তক মুণ্ডন করা যদি স্ত্রীর লজ্জার বিষয় হয়, তবে মস্তক আবৃত রাখুক।” ১ করিন্থীয় ১১ অধ্যায় : ৬ পদ। সাধু পৌলর এই উক্তিটির জন্য আজও সমগ্র খ্রীষ্টীয় সমাজ দন্দে জড়িয়ে পড়ে। কেউ বলেন মহিলা জাতির সকলকেই গির্জায় মাথা ঢেকে রাখতে হবে। আবার কেউ বলেন, শুধু বিবাহিত মহিলারাই মণ্ডলীতে মাথা ঢেকে রাখবেন। আবার কেউ বলেন, বিধবারাও এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু অবিবাহিতা মেয়েদের জন্য এই বিধান একদমই প্রযোজ্য নয়।
এখন প্রশ্ন হল, মণ্ডলীতে এই ঘোমটা কি সত্যিই বাধ্যতামূলক? না কি এটা শুধু একটা প্রতীক, কিংবা হৃদয়ের
ভক্তির বহিরপ্রকাশ? এই রহস্যময়
বিতর্কের জন্ম হয়েছিল অনেক বছর আগে, যখন সাধু পৌল করিন্থ নামক শহরের মণ্ডলীর লোকেদের কাছ থেকে কিছু জটিল প্রশ্ন
পেয়েছিলেন।
সেই সময়টা ছিল ৫৫ বা ৫৬
খ্রীষ্টাব্দের কাছাকাছি। পৌল তাদের সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বাইবেলের প্রথম করিন্থীয় ১১ অধ্যায়ে ২ থেকে ১৬ পদে এমন কিছু কথা লিখলেন যা ভবিষ্যতের জন্য
এক অজানা ঝড় তুলে দিয়েছেন। সেই থেকে দশকের পর
দশক, আজও গির্জার পালকেরা কিংবা প্রচারকেরা এবং
বাইবেলের শিক্ষকেরা এই নিয়ে তর্ক করেই চলেছেন।
বিষয়টা হল গির্জায় খ্রীষ্টান মহিলাদের কি মাথা
ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক বিষয়? না কি এর পিছনে লুকিয়ে আছে কোন বিশেষ ইতিহাস? এই প্রশ্নের জড়
যেন একটা পুরনো বট বৃক্ষের গাছের মূল, যা সময়ের সাথে আরও গভীরে চলে গেছে।
প্রথম খ্রীষ্টাব্দে, সাধু পৌলের কাছে করিন্থীয়
মণ্ডলীর থেকে একের পর এক প্রশ্ন আসছিল। এর মধ্যেই দুটি অত্যন্ত গুরুতর সমস্যা সামনে এলো।
প্রথমত - মণ্ডলীতে মহিলাদের মাথা ঢাকার বিষয় এবং দ্বিতীয়ত – সঠিকভাবে প্রভুর ভোজ সংক্রান্ত নিয়ম পালনের বিষয়।
সে সময়ে সমাজের রীতি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ইহুদি হোক, খ্রীষ্টান হোক
কিংবা অখ্রীষ্টান প্রায় সব মহিলাই জনসমক্ষে মাথা ঢেকে রাখতেন। যারা তাদের মাথা
ঢাকতেন না, সমাজ তাদেরকে খারাপ চোখে দেখত। এক কথায় তখনকার মানুষ মাথার আবরণহীন মহিলাকে ঠিক সেইভাবে দেখত, যেভাবে আজকের যুগে কেউ
খুব খোলামেলা পোশাক পরলে সমালোচনা করে। কিন্তু হঠাৎ খবর এল করিন্থের মণ্ডলীতে কিছু মহিলা
প্রার্থনা বা ভবিষ্যদ্বাণী করার সময় মাথা ঢেকে রাখছেন না। এই নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে
পড়ল। আর তখনই সাধু পৌল লিখলেন এক চিঠি, যা আজ আমরা ১ করিন্থীয় ১১ অধ্যায় হিসাবে দেখতে পাই, যেখানে তিনি
এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। সেই মুহূর্তে থেকেই বিতর্কের সূচনা হয়েছিল, তা কেবল কয়েক বছরের জন্য নয়
প্রায় কমবেশি দুই হাজার বছর ধরেই চলে
আসছে। আজও পালক, প্রচারক আর বাইবেল শিক্ষকরা প্রশ্ন করছেন মণ্ডলীতে মাথা ঢেকে রাখা কি ঈশ্বরের বিধান, নাকি কেবল সময়ের
প্রথা? কোথা থেকে উঠে এলো এই দীর্ঘদিনের বিতর্ক? উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই
প্রাচীন দিনের করিন্থের মণ্ডলীর দিকে।
কল্পনা করুণ, আপনি একটা পুরনো গ্রন্থাগারে বসে আছেন, চারপাশে ধুলোমাখা বই আর পাণ্ডুলিপি। আপনি খুঁজছেন
এমন একটা সত্য, যা বোঝাবে কেন মহিলাদের মাথা ঢাকার কথা
বাইবেলে এসেছে। এই রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে কিছু প্রাচীন পাতায়, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছে। বাইবেলে দুটি জায়গায় এই
বিষয়টা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, আর সেগুলো যেন দুটি জ্বলন্ত
মোমবাতি, যা আমাদের পথ দেখায়।
প্রথমটা দেখা যায় আদিপুস্তক ২৪ অধ্যায় :
৬৫ পদে। এখানে রেবেকা, যখন জানতে
পারলেন ইস্হাক তাঁর স্বামী হতে চলেছেন; তখনই তিনি তাড়াতাড়ি একটা আবরণ নিয়ে মাথা ঢেকে ফেললেন। এটা যেন একটা পুরনো
ছবি, যা আমাদের দেখায় সেই সময়ে মাথা ঢাকা কতটা
গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দ্বিতীয় দেখা যায় প্রথম করিন্থীয় ১১:১ থেকে ১৬
পদে। এখানে সাধু পৌল করিন্থীয়র মণ্ডলীকে বোঝাচ্ছেন, মাথা ঢাকার ব্যাপারটা কেন জরুরি। বিশেষ করে ৬ পদে তিনি বলেন, “ভাল, স্ত্রী যদি মস্তক আবৃত না রাখে, সে চুলও কাটিয়া ফেলুক; কিন্তু চুল কাটিয়া ফেলা কি
মস্তক মুণ্ডন করা যদি স্ত্রীর লজ্জার বিষয় হয়, তবে মস্তক
আবৃত রাখুক।” এই কথাগুলো যেন একটা প্রাচীন নদীর মতো,
যার স্রোত আজও বইছে, অনেকের মনে প্রশ্ন
জাগিয়ে।
এই দুটি জায়গাই যেন বাইবেলের সেই
পাতা, যেখানে মাথা ঢাকার ইতিহাস এবং তার তাৎপর্য লুকিয়ে আছে। এগুলো পড়লে মনে হয়, যেন
আমরা সেই সময়ের মানুষের পাশে বসে তাদের জীবনের ঘটনা শুনছি।
এই পদগুলোই হলো সেই নির্ভরযোগ্য আলো, যা এই বিতর্কের পথে
আমাদের হাত ধরে নিয়ে চলে।
খ্রীষ্টিয় সমাজে এমন অনেক সম্প্রদায়
আছে, যেখানে মহিলারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মণ্ডলীতে
মাথা ঢেকে রাখেন। বিশেষ করে মণ্ডলীতে যখন
প্রার্থনা বা আরাধনা হয়, তখন তারা বিশ্বাস করেন যে এই কাজ আসলে ঈশ্বরের প্রতি গভীর সম্মানের প্রকাশ। শুধু তাই নয়, অনেকেই এটিকে দেখেন স্বামীর প্রতি বশ্যতার প্রতীক হিসেবে। যেন মাথার আবরণ
বলে দিচ্ছে “আমি ঈশ্বরের সামনে বিনম্র, আর পরিবারে
ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি।” তাদের কাছে
মাথা ঢেকে রাখা কোনো সাধারণ বিষয় নয়; বরং এটি হয়ে ওঠে ভক্তি, শালীনতা ও আত্মসমর্পণের এক নীরব বহিঃপ্রকাশ।
ভিন্নমত থাকলেও কিভাবে সম্মান আর
বোঝাপড়ার সঙ্গে এই বিষয়টিকে দেখা যায়?
আমাদের প্রথমেই মনে রাখা দরকার,
সাধু পৌল যখন ১ করিন্থীয় ১১ অধ্যায় লিখেছিলেন, তখন তিনি আসলে মণ্ডলীর ভেতরে এক বিশেষ নিয়ম বা ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন। আর
সেই ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণভাবে খ্রীষ্টকেন্দ্রিক অর্থাৎ জাগতিক
ব্যবস্থার মতো নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন খ্রীষ্ট আছেন ঈশ্বরের অধীনে, পুরুষ আছেন খ্রীষ্টের অধীনে, আর নারী
আছেন পুরুষের অধীনে। এখানেই একটি আধ্যাত্মিক ক্রম আছে, যা
বাইবেল শেখায়। পৌল আরও সতর্ক করেছিলেন, যদি কোনো পুরুষ
মণ্ডলীতে মাথা ঢেকে প্রচার করে, তবে সে নিজের মাথাকে অসম্মান
করছে। এ কথার অর্থ বোঝা যায় একটা সহজ উদাহরণে মাধ্যমে। যেমন,
একজন সেনা বা পুলিশ তার উচ্চপদস্থ অফিসারের সামনে টুপি না পরে দাঁড়ায়, তবে তা অসম্মান জনক। কিন্তু যদি সেই
সেনা বা পুলিশ তার উচ্চপদস্থ অফিসারের সামনে টুপি পরে দাঁড়ায় তবে
তা সম্মান প্রদান করা হয়। তেমনি, পৌলের ভাষায়,
১ করিন্থীয় ১১:৫-এ দেখা যায় যে, মণ্ডলীতে যখন
কোনো নারী প্রার্থনা করেন বা ভাববাণী বলেন, তখন তার মাথা ঢাকা উচিত। অনেকেই ভাবেন, এখানে কেবল
“বিবাহিত স্ত্রীদের” কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আসলে তা নয়। কারণ, গ্রিক বাইবেলে যে শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, তা হলো “GUNE” (গুনে) যার
মানে শুধু “স্ত্রী” নয়, বরং যে কোনো নারী। অর্থাৎ বিবাহিত
হোক বা অবিবাহিত, উভয়ের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। এই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত
থাকলেও খ্রীষ্টানদের উচিত হবে বিষয়টিকে হালকা করে না দেখা। বরং বিষয়টা সম্মান আর বোঝাপড়ার জায়গা থেকে বুঝতে হবে। এটি কেবল
একটা কাপড়ের টুকরো নয়, বরং বিশ্বাস ও শৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত এক
গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা।
নারীদের মাথা ঢাকা নিয়ে সাধু পৌলের
শিক্ষা
সাধু পৌল ১ করিন্থীয় ১১ অধ্যায়ে
স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি কোনো নারী
প্রার্থনা, আরাধনা বা ভাববাণী করার সময় মাথা না ঢাকে,
তবে তা লজ্জার বিষয়। এরপর তিনি আরও গভীরে গিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন পুরুষ হলো
ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি ও গৌরব, আর নারী হলো
পুরুষের গৌরব। তাই একজন খ্রীষ্ট বিশ্বাসী নারীর কর্তব্য হলো
ঈশ্বর যাদেরকে তার জীবনে কর্তৃত্বের জায়গায় স্থাপন করেছেন যেমন পিতা, ভাই, দাদা, স্বামী বা পালক তাদের অধীনে থেকে নম্রতা ও বশ্যতা প্রদর্শন করা। এটি কেবল
সামাজিক নিয়ম নয়; এটি আত্মিক অনুশীলন।
পৌল একটি রহস্যময় কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্যও বলেছেন, যখন
মণ্ডলীতে প্রার্থনা সভা হয়, তখন শুধু মানুষ নয়, ঈশ্বরের দূতরাও সেখানে উপস্থিত থাকেন। যা আমরা ১
করিন্থীয় ১১ অধ্যায় : ১০ পদে দেখতে পাই।
সুতরাং পৌলের এই উক্তি থেকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে, আমরা
স্বর্গ দূতদের মাংসিক চোখে দেখতে না পেলেও তাঁরা ঈশ্বরের আরাধনার সময় উপস্থিত
থাকেন। আর তাই, নারীর মাথার আবরণ শুধু মানুষের জন্যই নয়, বরং স্বর্গদূতদের প্রতি সম্মানের
প্রতীকও বটে। যদি কোনো নারী মাথা না ঢেকে ঈশ্বরের মহিমা করে, তবে স্বর্গদূতেরা সেটিকে অসম্মান হিসেবে দেখতে পারেন।
পৌল বারবার নারীদের বলেছেন মণ্ডলীতে
মাথা ঢাকতে। তিনি এমনকি একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন “তোমরা আপনাদের মধ্যে বিচার কর, অনাবৃত মস্তকে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা কি স্ত্রীর উপযুক্ত?”
১ করিন্থীয় ১১ অধ্যায় : ১৩ পদ। এবং শেষে, তিনি ১ তীমথিয় ২ অধ্যায় : ৯ থেকে
১০ পদে এক অসাধারণ উপদেশ দিয়েছেন যা
হল, “আমি এও চাই, নারীরা পরিশীলিত সাজসজ্জা
করুক, শিষ্টাচার ও শালীনতা বজায় রাখুক। চুলের বাহার,
সোনা ও মণিমুক্তা বা বহুমূল্য পোশাক দ্বারা নয়, কিন্তু যে নারীরা নিজেদের ঈশ্বরের উপাসক বলে দাবি করে, তারা যোগ্য সৎকর্মের দ্বারা ভূষিত হোক।”
সবশেষে বিষয়টি দাঁড়ায় এমন মণ্ডলীতে
মহিলারা মাথা ঢাকবেন কি না, তা নির্ভর করে
তাদের মণ্ডলীর বাইবেলভিত্তিক শিক্ষা, তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস আর ঈশ্বরকে সম্মান জানানোর আন্তরিক মানসিকতার ওপর।
কারণ সত্যিই, যে সম্মান দেয়, সে-ই সম্মান ফিরে পায়। এই সম্মানের ধারণাটি যখন প্রভুর
ভোজের সাথে যুক্ত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে প্রভুর
ভোজ কেমন করে সঠিকভাবে পালন করা উচিৎ?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন