হাসপাতালের অন্ধকারে এক চিকিৎসক নারীর নীরব চিৎকার আজও সুবিচারের অপেক্ষায়। দ্রৌপদীর অপমান রাজসভার নীরবতায় ঢাকা পড়েছিল। হাসপাতালে মানুষের জীবন বাঁচে, কিন্তু এক নারীর জীবনের প্রদীপ সেখানেই অসময়ে নিভে গেল। দাউদের ক্ষমতার ছায়ায় বৎশেবার কণ্ঠ চিরতরে নিশ্চুপ। ক্ষমতার অপব্যবহারে নারীরা বারবার সামাজিক লালসার শিকার হচ্ছে। কিন্তু কেন?
৮ আগস্টের শেষ রাতে ৯ আগস্টের শুরুর মধ্য রাতে টানা ৩৬ ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রম করে এক উদীয়মান চিকিৎসক হাসপাতালের চেস্ট ডিপার্টমেন্টের তৃতীয় তলার সেমিনার হলে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়েছিল। তখনও সে জানত না এটাই তাঁর শেষ বিশ্রাম। সেই অভিসপ্ত রাতেই কলকাতা পুলিশের সিভিক ভলান্টিয়ার ৩৩ বছর বয়সী এক যুবক নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও শ্বাস রোধ করে খুন করে ঐ ডাক্তারকে। পরদিন সকালে তার সহকর্মীরা তার অর্ধনগ্ন দেহ গুরুতর আঘাত সহ উদ্ধার করেন হাসপাতালের ওই তিন তালার সেমিনার হল থেকে।
এক নারীর জীবন নিভে গেল হাসপাতালের নির্জন কক্ষে, কিন্তু হাজার বছর আগেও আর এক নারীর অপমান রাজসভার নীরবতায় ঢাকা পড়েছিল। যেখানে আমরা দেখতে পাই কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার বারবার নারীদের শিকার বানায়।“তুমি প্রথমে কাকে হারিয়েছ, নিজেকে না আমাকে?”
মহাভারতে দ্রৌপদীর এই প্রশ্ন রাজসভায় আলোড়িত হয়, কিন্তু উত্তর মেলেনি। পাশা খেলায় পাণ্ডবরা সব হারানোর পর কর্ণ
যুধিষ্ঠিরকে দ্রৌপদীকে বাজি রাখতে উৎসাহ দেয়। মরিয়া
যুধিষ্ঠির ভাবেন, এক চালেই সব ফিরে
পাবেন। কিন্তু
ক্ষত্রিয় ধর্মে পাশা খেলার চ্যালেঞ্জ প্রত্যাখ্যান করা অধর্ম ছিল। তাই অসহায় দ্রৌপদী
হয়ে ওঠেন ক্ষমতার খেলার শিকার।
রাজশেখর বসুর বাংলা মহাভারতের সভা পর্বে, পাশা খেলার নির্মম মঞ্চে দ্রৌপদীর অপমানের ঘটনাটি জ্বলজ্বল করে। দুর্যোধনের নির্দেশে সূতপুত্র প্রতিকামী তাঁকে টেনে আনতে ছুটে যায়, যখন দ্রৌপদী মাসিক শারীরবৃত্তি অবস্থায় মাত্র একটি বস্ত্রে আবৃত ছিলেন। তিনি সূতপুত্রের মাধ্যমে ছুঁড়ে দেন এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন: “যুধিষ্ঠির কি প্রথমে নিজেকে হারিয়েছেন, নাকি আমাকে?” এই প্রশ্নে রাজসভা স্তব্ধ, তাঁর স্বামীদের কাছেও কোনো উত্তর নেই। দুঃশাসন নির্দয়ভাবে তাঁর কেশ ধরে টেনে আনে। দ্রৌপদী কুন্তী ও গান্ধারীর কাছে আর্তনাদ করেন, কিন্তু নীরবতাই তাঁদের জবাব। তিনি গর্জে ওঠেন, “আমি কি শুধুই সম্পত্তি?” কিন্তু কর্ণ তাঁকে “পাঁচ স্বামীর স্ত্রী” বলে অপমান করেন, ও বলে ওঠেন এমন মহিলার কিছু বলার অধিকার নেই। একথা বলা মাত্র দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্র খুলে ফেলার চেষ্টা করেন। ওই মুহূর্তে সভায় উপস্থিত সকলে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন।
আচ্ছা এই নীরবতা কি শুধু রাজসভার
মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এই ঘটনার হাজার বছর আগেও ক্ষমতার অন্ধকার ছায়া নারীদের কণ্ঠ চেপে ধরেছিল। এক রাজপ্রাসাদে,
যেখানে ন্যায়ের প্রতিশ্রুতি থাকার কথা, কিন্তু তার বদলে এক নারীর জীবন কীভাবে অপমানের শিকার হল? এক রাজার কুবাসনা এক নারীকে চিরতরে নিশ্চুপ
করে দিয়েছিল।
বাইবেলের ২ শমূয়েল
১১ অধ্যায়ে লুকিয়ে আছে এক নৃশংস ঘটনা, যা ক্ষমতার
অপব্যবহারের কালো দাগ হয়ে রয়েছে। রাজা দাউদ, যার নিজের
যুদ্ধে যাওয়ার কথা ছিল, তিনি সেখানে না গিয়ে জেরুশালেমে থেকে যান। এক পরন্ত বিকেলে, রাজপ্রাসাদের ছাদে পায়চারি করতে করতে তিনি দেখেন যে, এক অপরূপ
সুন্দরী নারী, বৎশেবা, স্নান করছেন। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীর এক অন্যতম সেনা ঊরিয়ের
স্ত্রী। সেই সময় দাউদের মনে কুবাসনা
তাঁকে টানে। তিনি দূত পাঠান, বৎশেবাকে প্রাসাদে
ডেকে আনেন এবং তারা সহবাসে লিপ্ত হন। এই ঘটনা কি শুধুই
একটি ঘটনা, নাকি ক্ষমতার
অপব্যবহারের ভয়ঙ্কর প্রতিচ্ছবি?
কিন্তু এই ঘটনাটি কি শুধুই
এক রাজার কুবাসনার ঘটনা? নাকি এটি এক নারীর নীরব কান্নার
আর্তনাদ, যিনি ক্ষমতার
ছায়ায় পিষ্ট হয়েছিলেন? এই ঘটনার আরও গভিরে, যেখানে বৎশেবার অসহায়তা প্রকাশ করে ক্ষমতার ভয়াবহ
অপব্যবহারের আড়ালে, যা আজও আমাদের
সমাজে প্রায়শই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
তৎকালীন ইসরায়েলের ভূমিপুত্র সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর রাজা দাউদের সামনে বৎশেবা ছিলেন এক সাধারণ নারী, যার স্বামী রাজার জন্য যুদ্ধে প্রাণপণ লড়ছিল। রাজার ডাক এলে বৎশেবার না বলার কোনো ক্ষমতাই ছিল না, রাজার আহবান অমান্য করা মানে শাস্তির মুখোমুখি হওয়া। বাইবেলের পণ্ডিতরা বলেন, বৎশেবা ছিলেন “নিরপরাধ শিকার”, কোনো প্রলোভনকারী নন। Theology of Work-এর গবেষণা চিৎকার করে বলে, “বৎশেবাকে ব্যভিচারী বলে দোষ দেওয়া মানে শুধু বাইবেলের সত্যকে উপেক্ষা করাই নয়, ভুক্তভোগীকেও অপমান করা। অবশ্যই এটি ছিল ধর্ষণ; দাউদের ক্ষমতার নির্মম অপব্যবহার। ঈশ্বর যেমন বৎশেবার নীরব কান্না দেখেছিলেন, তেমনি আজও তিনি দেখেন ক্ষমতার ছায়ায় নিপীড়িত প্রতিটি নারীর আসহায় আর্তনাদ।” এই দৃষ্টান্ত কি শুধুই অতীত, নাকি আমাদের সমাজের ও আয়না?
দাউদের অন্যায়ের
পর ঈশ্বরের শাস্তি ছিল শুধু মাত্র সময়ের অপেক্ষা। ঈশ্বরের নির্দেশে ভাববাদী নাথন একটি উপমা নিয়ে হাজির হন; সেটি
হল এক ধনী আর এক দরিদ্রের কাহিনী। ধনীর ছিল অগণিত পশু, কিন্তু
দরিদ্রের শুধু একটি শাবক মেষী, যাকে সে মেয়ের মতো লালন করত। ধনী অতিথির জন্য নিজের পশু রেখে
দরিদ্রের প্রিয় মেষী ছিনিয়ে নেয়। এই কাহিনী শুনে
দাউদ রাগে ফেটে পড়েন, বলেন, “এই নিষ্ঠুর লোক মরণযোগ্য! তার
চারগুণ দাম ফেরত দিতে হবে!” তখন নাথনের
তীক্ষ্ণ কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়, “আপনিই সেই
লোক!” এই মুহূর্তটা কি শুধুই একটি কাহিনী,
নাকি ক্ষমতার অপব্যবহারের নগ্ন সত্যের মুখোশ খোলার মুহূর্ত?
( যা আমরা ২ শমূয়েল ১২ অধ্যায় দেখতে পাই )।
আচ্ছা নাথনের এই তীক্ষ্ণ কথা কি
শুধুই একটি কাহিনীর সমাপ্তি? নাকি এটি
ঈশ্বরের ন্যায়বিচারের ভয়ঙ্কর শুরু? চলুন, ইতিহাসের পাতা
উল্টে দেখি, কীভাবে দাউদের পাপের মূল্য তাকে হাড়ে হাড়ে টের
পেতে হল, এবং কেন এই শাস্তি আজও আমাদের মনে শিহরণ জাগায়।
ভাববাদী নাথনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠে রাজা
দাউদের পাপের তালিকা উঠে আসে, আর ঈশ্বরের শাস্তি ছায়ার মতো
ঝুলে থাকে। তাৎক্ষণিক শাস্তি ছিল হাড় কাঁপানোর মতো। দাউদ ও বৎশেবার সন্তানের জীবন ঈশ্বর কেড়ে নেন,
কারণ ঐ সন্তানটি ছিল ব্যভিচারের ফল। যেখানে বাইবেল বলে “ব্যভিচার
করিও না।” যাত্রাপুস্তক ২০ অধ্যায় : ১৪ পদ। নাথন রাজসভা ছাড়তেই শিশুটি অসুস্থ হয়, দাউদ ঈশ্বরের
কাছে মিনতি করেন, উপবাস করেন, মেঝেতে শুয়ে রাত কাটান, তার পরেও ঈশ্বর দাউদের প্রার্থনা শোনেননি। কারণ তিনি পাপকে প্রশয় দেন না। এর ঠিক সাত দিন পর ঐ
শিশুটি মারা যায়। এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘমেয়াদী অভিশাপ, পারিবারিক কলহের আগুন। ঈশ্বরের নামে ঈশ্বরের কথাই ভাববাদী নাথন ঘোষণা করেন, “তরোয়াল তোমার বংশ থেকে কখনো দূর
হবে না। তুমি ঈশ্বরকে অগ্রাহ্য
করে ঊরিয়ের স্ত্রীকে নিয়েছ,
এবার তোমার স্ত্রীদের দিনের আলোয় অন্যের হাতে তুলে দেওয়া হবে!” যা তুমি যা গোপনে করেছ
তার পরিবর্তে আমি স্পষ্ট দিনের আলোতে ইসরাইলের সামনে এমনটা করব। এই শাস্তি কি শুধু দাউদের জন্য, নাকি ক্ষমতার
অপব্যবহারের পরিণতির চিরন্তন সতর্কতা?
আচ্ছা, নাথনের এই ভবিষ্যদ্বাণী কি শুধুই একটি শিশুর মৃত্যুতে থেমে গিয়েছিল? নাকি এটি ছিল দাউদের বংশে এক অবিরাম
বিপর্যয়ের সূচনা? যেখানে এক
রাজার পাপের পরিণতি তাঁর পরিবারকে অভিশাপের আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল, যা পরবর্তী কালে আমাদের
নেতৃত্বের জন্য রেখে গিয়েছিল চিরন্তন শিক্ষা। ঠিক
যে ভাবে বাইবেল বলে “ব্যভিচার করিও না।” ও “তোমার প্রতিবাসীর গৃহে লোভ করিও না; প্রতিবাসীর স্ত্রীতে, কিম্বা তাহার দাসে কি দাসীতে, ………” যাত্রাপুস্তক ২০ অধ্যায়
: ১৪ ও ১৭ পদ।
ঈশ্বরের নির্দেশে দাউদের জীবনে নেমে আসে শাস্তির ঝড়। আম্নোনের হাতে তামরের ধর্ষণ, আবশালোমের হাতে আম্নোনের হত্যা, গৃহযুদ্ধের আগুন, আর দাউদের উপপত্নীদের প্রকাশ্যে অপমান। নাথনের “চারগুণ প্রতিশোধ” ভবিষ্যদ্বাণী নিখুঁতভাবে পূর্ণ হয়। বাইবেল এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কেউই পাপের শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। এমনকি ঈশ্বরের অভিষিক্ত রাজাও নয়। দাউদের পতন প্রমাণ করে, ক্ষমতা নৈতিকতার ঢাল নয়। তিনি শোষকে পরিণত হয়েছিলেন, জনগণের রক্ষক নয়। ঈশ্বর, নিরপেক্ষ বিচারক, তাঁর রাজকীয় মর্যাদা উপেক্ষা করে বিচার করেন। পরবর্তীকালে রাজা দাউদ অনুতপ্ত হলে ঈশ্বর ক্ষমা করেছিলেন বটে (২ শমূয়েল ১২:১৩), কিন্তু রাজা দাউদ পার্থিব শাস্তি এড়াতে পারেননি। এই ঘটনা কি শুধুই অতীতের, নাকি আজকের নেতাদের জন্যও চিরন্তন সতর্কবাণী?
কিন্তু পাপের এই
ছায়া কি শুধু রাজপ্রাসাদে সীমাবদ্ধ? নাকি এটি মানুষের হতাশা ও অন্ধকারের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে?
.png)
.png)
.png)
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন