আমরা কি সত্যিই গ্রহ বা নক্ষত্রের হাতের পুতুল? প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেদের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ খুঁজেছে। ভারতের মাটিতে জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রভাব আরও গভীর, যা দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই বিশ্বাস কি বাইবেলের শাশ্বত সত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এই ভিডিওতে আমরা সেই আধ্যাত্মিক সংকট ও উত্তরণের পথ অনুসন্ধান করব।
এখন প্রশ্ন হলো: জ্যোতিষবিদরা কি সত্যিই গ্রহ বা নক্ষত্রদের অবস্থান দেখে আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে সক্ষম? আর যদি না পারেন, তবে কেন কোটি কোটি
মানুষ প্রতিদিন জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর ভরসা করেন? যখন রাতের অন্ধকার আকাশে নক্ষত্ররা জ্বলে ওঠে, তখন তাদের নিঃশব্দ সৌন্দর্য মানুষের মনে বিস্ময় ও কৌতূহল
জাগায়। ভারতের প্রাচীন
সংস্কৃতিতে, এই নক্ষত্ররা শুধু মাত্র
আলোর বিন্দু নয়,
বরং ভাগ্যের দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়। জ্যোতিষশাস্ত্র, যা গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের
পূর্বাভাস দেয়। বিবাহ থেকে শুরু
করে কর্মজীবন, এমনকি দৈনন্দিন
সিদ্ধান্তেও জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রভাব অপরিসীম। কিন্তু যখন একজন খ্রীষ্টান এই নক্ষত্রের দিকে
তাকায়, তখন তার মনে কী
প্রশ্ন জাগে? তারা কি ঈশ্বরের
সৃষ্টির সাক্ষ্য দেয়, নাকি মানুষের ভাগ্য
নিয়ন্ত্রণের পূর্বাভাস প্রদান করে? এই প্রশ্নটি
খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি গভীর ধর্মতাত্ত্বিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের জন্ম
দেয়।
এই ভিডিওতে আমরা সেই দ্বন্দ্ব, কৌতূহল আর
আধ্যাত্মিক বাস্তবতা একত্রে অনুসন্ধান করব। বাইবেলের শাশ্বত সত্যের আলোকে
উন্মোচন করব শয়তানের দ্বারা তৈরি করা জ্যোতিষশাস্ত্রের মায়াজাল এবং দেখব কীভাবে
খ্রীষ্টান সম্প্রদায় এই সংকট থেকে বেরোতে পারে।
মানুষ কেন ভবিষ্যতের বিষয়ে জানতে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন? কেন তারা জানতে চান, আগামীকাল কী ঘটবে? এই কৌতূহল থেকেই জন্ম নিয়েছে জ্যোতিষশাস্ত্রের মতো বিদ্যা, যা দাবি করে; গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান দেখে মানুষের ভাগ্য বলে দেওয়া সম্ভব। প্রাচীন বাবিলের পণ্ডিত ব্যক্তি থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক সমাজের সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জ্যোতিষশাস্ত্র সর্বত্র একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছে।
“আজ আপনার দিনটি
কেমন যাবে?”, “আপনার রাশিচক্রে কি
উন্নতির সম্ভাবনা আছে?”, “শুভ বিবাহ সম্পন্ন
করতে এই তিথিই সেরা!”—এই ধরনের শিরোনামগুলি যেন প্রতিনিয়ত আমাদের কৌতূহলকে আরও
উসকে দেয়। কিন্তু এই কৌতূহলের
গভীরে কি লুকিয়ে আছে এক অজানা ভয়? ভবিষ্যৎ নিয়ে
অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট, স্বাস্থ্যগত জটিলতা বা পারিবারিক সমস্যা—যখন মানুষ জীবনের
এই কঠিন পরিস্থিতিগুলোর মুখোমুখি হন, তখন তারা দ্রুত
সমাধানের আশায় এই প্রাচীন প্রথাগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েন।
বিশেষ করে খ্রীষ্টীয় সমাজে নতুন বিশ্বাসী যারা তারা তাদের
পূর্ববর্তী ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংস্কার থেকে পুরোপুরি
মুক্ত হতে পারেননি, তারা হয়তো তাদের অজান্তেই
এই কৌতূহলী চর্চায় জড়িত হন। তারা কি জানেন না, বাইবেল এই বিষয়ে কী বলে? নাকি সামাজিক চাপ তাদের এমন এক পথে ঠেলে দেয় যা তাদের
বিশ্বাসের মূল ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দেয়?
বাইবেলের পাতায় পাতায় ঈশ্বরের মহিমা আর তাঁর সৃষ্টির বর্ণনা রয়েছে। গীতসংহিতা ৮ অধ্যায় : ৩ পদে লেখা
আছে, “আমি তোমার
অঙ্গুলি-নির্মিত আকাশ-মণ্ডল, তোমার স্থাপিত
চন্দ্র ও তারকামালা নিরীক্ষণ করি”। আবার গীতসংহিতা ১৪৭ অধ্যায়: ৪
পদে লেখা আছে, “তিনি তারাগণের
সংখ্যা গণনা করেন, সকলের নাম ধরিয়া
তাহাদিগকে ডাকেন”। বাইবেল বলে “আকাশমণ্ডল ঈশ্বরের
গৌরব বর্ণনা করে, বিতান তাঁহার
হস্তকৃত কর্ম জ্ঞাপন করে।” গীতসংহিতা ১৯
অধ্যায় : ১ পদ।
“পরে ঈশ্বর কহিলেন, রাত্রি হইতে দিবসকে বিভিন্ন করণার্থে আকাশমণ্ডলের বিতানে
জ্যোতির্গণ হউক; সেই সমস্ত চিহ্নের
জন্য, ঋতুর জন্য এবং
দিবসের ও বৎসরের জন্য হউক” আদিপুস্তক ১ অধ্যায় : ১৪ পদ। ঈশ্বরের এই
বাক্যগুলো আমাদের কী শেখায়? এটি শেখায় যে
ঈশ্বরই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা এবং পরিচালক। গ্রহ-নক্ষত্র তাঁর দ্বারা সৃষ্টি, তাঁর হাতের কাজ,
তাঁর ক্ষমতা ও মহিমার নিদর্শন। বাইবেল স্পষ্ট করে
যে নক্ষত্রগুলি ঈশ্বরের “হস্তনির্মিত”।
ঈশ্বরের সৃষ্টি এই তারা বা নক্ষত্র গণের মূল উদ্দেশ্য হল : ১. সময় নির্ণয় : কৃষি, উৎসব ও ঋতুচক্রের হিসাব। ২. দিকনির্দেশ : প্রাচীন নাবিকরা নক্ষত্র দেখে পথ খুঁজতেন। ঠিক যেভাবে পূর্বদেশীয় পণ্ডিতগণ এক বিশেষ নক্ষত্র দেখে তা অনুসরণ করে বেথলেহেমে এসে শিশু যীশুকে খুঁজে পান, এবং তাঁকে রাজাধিরাজ হিসেবে সম্মান জানিয়ে স্বর্ণ, কুন্দুরু ও গন্ধরস নিবেদন করেন। মথি ২ অধ্যায় : ১ থেকে ১১ পদ। বাইবেল আরও শিক্ষা দেয় যে, ঈশ্বর এই তারাগুলোকে সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজিয়েছেন, যাকে আমরা নক্ষত্রমণ্ডল বলি।
বাইবেলে Orion, the Bear
(Ursa Major), the crooked serpent (Draco), এবং Pleiades (সাত তারা) এর মতো নক্ষত্রমণ্ডলগুলোর
উল্লেখ আছে (ইয়োব ৯:৯; ৩৮:৩১-৩২; আমোস ৫:৮)। এই
নক্ষত্রমণ্ডলগুলো “চিহ্ন” এবং “ঋতু” নির্ধারণের জন্য
দেওয়া হয়েছিল—অর্থাৎ, ঈশ্বর তারা বা নক্ষত্র সময়
এবং দিক নির্দেশনার জন্য সৃষ্টি করেছিলেন। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ
দিকনির্দেশনার জন্য তারার ব্যবহার করে আসছে।
কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় যখন মানুষ এই সৃষ্ট জিনিসকে, অর্থাৎ এই তারাদের, সৃষ্টিকর্তার চেয়েও বেশি ক্ষমতাশীল মনে করে। জ্যোতিষশাস্ত্রের বিশ্বাসের মূল
ভিত্তি হলো, এই গ্রহ বা নক্ষত্র
মানুষের ভাগ্যের উপর প্রভাব ফেলে। জ্যোতিষীরা দাবি করেন
যে, আপনি যে রাশিতে
জন্মগ্রহণ করেছেন অর্থাৎ কুম্ভ, মীন, মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু বা মকর—তা আপনার ভাগ্যকে প্রভাবিত করে।
জ্যোতিষশাস্ত্র আমাদের বলে যদি, তুমি কুম্ভ রাশির
জাতক; তাহলে তুমি ভাবুক, শান্ত, ধৈর্যশীল। তুমি যদি সিংহ রাশির জাতক
হও তাহলে তুমি
কর্তৃত্বপরায়ণ, গর্বিত ইত্যাদি ইত্যাদি কিছু। বাইবেল এই ধারণাকে “মিথ্যা বিশ্বাস” বলে অভিহিত করে।
আচ্ছা বাইবেলের আঙ্গিকে তারা বা নক্ষত্র যদি শুধু সময় ও দিক
নির্দেশনের জন্য মানচিত্রের কাজ করে, তাহলে মানুষ সেগুলোকে ভাগ্যের বিধাতা বানালো কীভাবে? একবার ভাবুন তো, প্রাচীন বাবিলের রাজ জ্যোতিষীদের কী হয়েছিল? বাইবেলে দানিয়েলের পুস্তক ১ অধ্যায়: ২০ পদে দেখায় যে, ঈশ্বরের মনোনীত ও আশীর্বাদ প্রাপ্ত ভাববাদী দানিয়েলের
জ্ঞানের কাছে তারা লজ্জিত হয়েছিল কারণ তারা রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে অক্ষম
ছিলেন। এর কারণ কী? কারণ তাদের জ্ঞান নক্ষত্র থেকে আসেনি, এসেছিল মানুষের অনুমানের উপর ভিত্তি করে।
যিশাইয় ৪৭ অধ্যায়: ১৩ থেকে ১৪ পদে ঈশ্বর জ্যোতিষীদেরকে তাদের মিথ্যাচারের জন্য নিজের বিচার দ্বারা দগ্ধ করে দেবেন বলে সতর্ক করেছেন। ঈশ্বর ইস্রায়েল জাতিকে “সূর্য, চাঁদ ও তারাদের” পূজা করতে বা তাদের সেবা করতে সরাসরি নিষেধ করেছেন, যা আমরা দ্বিতীয় বিবরণ ৪ অধ্যায়: ১৯ পদে দেখতে পাই। “আর যখন তোমরা আকাশের দিকে তাকাবে এবং সূর্য, চাঁদ ও তারাদের—আকাশের সমস্ত বিন্যাস—দেখে ভ্রান্ত হয়ে তাদের প্রতি নত হোয়ো না এবং আরাধনা কোরো না কারণ এগুলি তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভু আকাশের নিচে সমস্ত জাতিকে দিয়েছেন।” কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হল, ইস্রায়েল জাতি এই পাপেই লিপ্ত হয়েছিল। যা আমরা ২ রাজাবলি ১৭ অধ্যায়: ১৬ পদে দেখতে পাই “তারা তাদের ঈশ্বর সদাপ্রভুর সব আদেশ ত্যাগ করল এবং নিজেদের জন্য বাছুরের আকৃতিবিশিষ্ট দুটি প্রতিমার মূর্তি ও আশেরার একটি খুঁটি তৈরি করে নিয়েছিল। তারা আকাশের সব তারকাদলের কাছে মাথা নত করত, ও বালদেবেরও পুজো করত।” আর প্রতিবারই তাদের এই তারা বা নক্ষত্র গণকে পূজার জন্য ঈশ্বরের কঠিন বিচার নেমে এসেছিল।
তাহলে, বাইবেলের দৃষ্টিকোণ
থেকে, জ্যোতিষশাস্ত্র
কেবল একটি নিছক ভুল ধারণা নয়, এটি ঈশ্বরের
সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ। এটি সৃষ্টিকর্তার
পরিবর্তে সৃষ্ট বস্তুকে উপাসনা করার সমতুল্য। এটি নতুন বিশ্বাসীদেরকে ঈশ্বরের উপর পূর্ণ নির্ভরতা থেকে সরিয়ে মানব সৃষ্ট
জাগতিক শাস্ত্রের উপর নির্ভরশীল করে তোলে। যা আধ্যাত্মিকভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই কথাটি শুধুমাত্র
নব্য বিশ্বাসীদের জন্যই প্রযোজ্য তা নয় বরং সমগ্র খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের জন্য একইভাবে
প্রযোজ্য।
দুঃখের বিষয় হল যে, মণ্ডলীতেও মেষেদের এই বিষয়ে যথাযথভাবে
শিক্ষা দেওয়া হয় না। মণ্ডলীতে অনেকে
বিশ্বাস করেন, “আমি যীশুকে মানি, কিন্তু রাশির ব্যাপারটা তো খারাপ কিছু নয়”। এখানেই শুরু হয় সমস্যা। বাইবেল যখন ঈশ্বরের ওপর শতভাগ
নির্ভরতার শিক্ষা দেয়, তখন এই ধরনের আপস
বিশ্বাসে বিভ্রান্তি আনে। ভারতে
জ্যোতিষশাস্ত্র শুধু ভবিষ্যদ্বাণীই নয় বরং এটি এক নির্ভরশীলতা।
এখন এই ভিডিওর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, বর্তমানে খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীগুলো কীভাবে এই ধরণের সংকট মোকাবিলা করবে?
১. মণ্ডলীতে নিয়মিত বাইবেল ক্লাস করা,
যেখানে শিক্ষার্থীদের সাথে সরাসরি ভাবে বাইবেলের বিভিন্ন প্রশ্ন
উত্তরের মাধ্যমে স্পষ্ট ভাবে ঈশ্বর
নির্ভরতার প্রতি আস্থাশীলতা গড়ে তোলা।
২. মণ্ডলীর নেতাদের অর্থাৎ পালক ও বিশপদের যথেষ্ট সচেতন হতে হবে, যাতে তারা পরিষ্কারভাবে বাইবেলের যথাযথ শিক্ষা বিশ্বাসীদের
কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে পারেন।
৩. সাংস্কৃতিক দিক: জ্যোতিষের পরিবর্তে “ঈশ্বরের নিদর্শন” হিসাবে নক্ষত্র বোঝানো
(যেমন: বেথলেহেমের তারা)। গির্জাগুলির উচিত সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে সংবেদনশীল হয়ে
শিক্ষা প্রদান করা।

.png)
.png)
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন