সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা ভাবনা মণ্ডলীর অধ্যাত্মিক পথের বাধা বাইবেলের বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি | Self-centered thinking is an obstacle to the spiritual path of the church. Biblical analysis and perspective

নমস্কার প্রিয় পাঠক বন্ধুরা, প্রত্যেক খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের অধ্যাত্মিক জীবনে মণ্ডলীর গুরুত্ব অপরিসীম। মণ্ডলী হল একটি অধ্যাত্মিক পরিবার, যেখানে বিশ্বাসীরা একত্রিত হয়ে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে এবং নিজেদের জীবনকে ঈশ্বরের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সাহায্য করে। তবে, যদি মণ্ডলীর দৃষ্টিভঙ্গি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যায় এবং জাগতিক বিষয়ের প্রতি অতিমাত্রায় মনোযোগ দেয়, তাহলে তা একটি গভীর বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আজকের দিনে, বিলাসিতা ও সমাজে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যার ফলে অনেক সময় মণ্ডলী নিজেদের অধ্যাত্মিক দায়িত্বকে ভুলে গিয়ে জাগতিক বিষয়ের সঙ্গে আপস করতে শুরু করে। এই জাগতিক এবং আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা অনেক সময় একজন খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসীকে তাঁর বিশ্বাসী বন্ধু ও পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং অধ্যাত্মিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসীরা যখন নিজেদের অজান্তে অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন তারা ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনা থেকে বিচ্ছিন্নও হয়ে যায়

জগতের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণের ফলে কোন বিশ্বাসী ব্যক্তি এবং মণ্ডলী তাদের অধ্যাত্মিক মূল্যবোধ হারাতে পারে। আধুনিক সমাজে, যেখানে বাহ্যিক সাফল্য ও ভোগবাদী জীবনধারা অধিক গুরুত্ব পায়, সেখানে মণ্ডলীর সদস্যরা তাদের অধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যগুলি ভুলে যেতে শুরু করে। এই প্রবণতা শুধুমাত্র কোনও বিশ্বাসী ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধ্যাত্মিক অবক্ষয় নয়, বরং সামগ্রিকভাবে মণ্ডলীর অধ্যাত্মিক অবক্ষয়ের কারণও হতে পারে। যা এক কথায় অধ্যাত্মিক শিথিলতাও বলা যেতে পারে।

প্রকাশিত বাক্য ৩ অধ্যায় : ১৫ থেকে ১৬ পদে উল্লেখ আছে, আমি জানি তোমার কার্য সকল, তুমি না শীতল না তপ্ত; তুমি হয় শীতল হইলে, নয় তপ্ত হইলে ভাল হইত। এইরূপে তুমি ঈষদুষ্ণ, না তপ্ত না শীতল, এই জন্য আমি নিজ মুখ হইতে তোমাকে বমন করিতে উদ্যত হইয়াছি এখানে ঈশ্বর স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মণ্ডলীতে যদি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে পুরোপুরি ভাবে সাধন না হয় এবং জাগতিক বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়, তবে তাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। এই বাক্যটি সুনির্দিষ্ট ভাবে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত ও নিষ্ঠাবান এবং জগত থেকে পৃথক থাকাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের কখনোই ভুলে গেলে চলবে না প্রথম শতাব্দীতে মণ্ডলীর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল জাগতিক বিষয়গুলি থেকে পৃথক থাকা। তারা নিজেদের জীবনযাত্রা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনার জন্য সম্পূর্ণ নিবেদিত ছিলেন। কিন্তু রোম সাম্রাজ্যের সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের কারণে অনেক মণ্ডলী জাগতিক বিষয়গুলির সাথে আপস করতে শুরু করে; যা পরিণতি, তাদের অধ্যাত্মিক পতন হয়। এই ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, এই বিশ্বসংসারের প্রভাব থেকে নিজেদের ও মণ্ডলীকে রক্ষা করা কতটা আবশ্যকএই আপোষ কামী তাই হলো শিথিলতার অন্যতম কারণ।

এখন প্রশ্ন হল বাইবেলের মতে ‘আত্মকেন্দ্রিকতা’ কাকে বলে ? আত্মকেন্দ্রিকতা হলো এমন একটি মানসিকতা, যেখানে ব্যক্তি বা মণ্ডলী নিজেদের প্রয়োজনের প্রতি এতটাই মনোযোগী হয়ে ওঠে যে, ঈশ্বরের প্রাধান্য তাদের কাছে গুরুত্ব হারায়। যখন মণ্ডলীর মধ্যে ও ব্যক্তিগত জীবনে এই ধরনের মানসিকতা দেখা দেয়, তখন সেটি ধীরে ধীরে ঈশ্বরের নির্দেশনাগুলো উপেক্ষা করতে শুরু করে এবং জাগতিক চাহিদার সঙ্গে নিজেদের গা ভাসিয়ে দেয়

বর্তমান সময়ে কিছু মণ্ডলী জাগতিক জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য তাদের নীতি পরিবর্তন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, মন্ডলীতে ঈশ্বরের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন না করা এবং একই সাথে মন্ডলীতে পোশাক-আশাকের প্রতি গুরুত্ব না দেওয়া।

কোন মণ্ডলী যখন জাগতিক বিষয়গুলির সঙ্গে আপস করতে শুরু করে, তখন তাদের মূল খ্রীষ্টীয় আদর্শের থেকে বিচ্যুতি ঘটে। এই প্রক্রিয়ায়, মণ্ডলীর সদস্যরা ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকার পরিবর্তে, বিভিন্নও জাগতিক কারণে নিজেদের অধ্যাত্মিক নীতি পরিবর্তনের শিকার হন। ফলে, তারা ধীরে ধীরে শয়তানের সুচতুর পাতা ফাঁদে নিজেদের অজান্তেই জড়িয়ে পরে।

মণ্ডলীর আত্মকেন্দ্রিকতা লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, তাদের আচরণ ও চিন্তা ভাবনায় জাগতিক প্রভাব। যখন মণ্ডলী জাগতিক হয়ে ওঠে, তখন তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, ভোগবিলাস এবং স্বার্থপরতা বৃদ্ধি পায়। এটি তাদের মধ্যে ঐক্যহীনতা সৃষ্টি করে এবং তারা নিজেদের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পরিচয়কে ভুলে যেতে শুরু করেএর ফল স্বরূপ তারা ঈশ্বরের বাক্যের থেকে দূরে সরে যায়। আর এই কারণেই মণ্ডলীর অধ্যাত্মিক ভবিষ্যৎ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হতে শুরু করে

আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্ট ধর্মতত্ত্ববিদ সি. এস. লুইস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Screwtape Letters”( স্ক্রুটেপ লেটারস ) এ উল্লেখ করেছেন যে, “দুর্বল বিশ্বাসীদের জন্য শয়তানের প্রধান অস্ত্র হল তাদের মনোযোগ জাগতিক বিষয়ের দিকে সরিয়ে নেওয়া। এই বক্তব্যটি বিশেষভাবে মণ্ডলীর সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য, যারা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে জাগতিক বিষয়গুলির প্রতি অতিমাত্রায় মনোযোগ দেয়।

অতএব, মণ্ডলীর আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করে ঈশ্বরকেন্দ্রিক জীবনযাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাইবেলে লেখা আছে হে ব্যভিচারিণীগণ, তোমরা কি জান না যে, জগতের মিত্রতা ঈশ্বরের সহিত শত্রুতা? সুতরাং যে কেহ জগতের মিত্র হইতে বাসনা করে, সে আপনাকে ঈশ্বরের শত্রু করিয়া তুলেযাকোব ৪ অধ্যায় : ৪ পদ। খ্রীষ্ট বিশ্বাসী মণ্ডলীর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যে, ঈশ্বরের দিকে ফিরে আসা এবং তাঁর নির্দেশনায় জীবনযাপন করার মাধ্যমে শিথিলতা নামক কঠিন আত্মিক দুরারোগ্য রোগের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

খ্রীষ্টান নিপীড়নের রহস্য; বাইবেলের বাণী ও ঈশ্বরের পরিকল্পনা / The Mystery of Christian Persecution; The Word of the Bible and God's Plan

  কল্পনা করুন , এক গভীর রাত। একটি ছোট্ট ঘরে কয়েকজন মানুষ ভয়ে জড়ো হয়েছেন। তাদের হাতে একটি বই — বাইবেল। তাদের প্রার্থনা একটি গোপন অপরাধ। কেন ? কারণ তাদের বিশ্বাস তাদের জীবনের জন্য হুমকি। এই ঘটনাটা কি শুধুই কল্পনা ? না , এটি আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ই ঘটে চলেছে । আজ আমরা জানব , কেন খ্রীষ্টানরা নির্যাতিত হচ্ছেন , এবং তারই পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা কীভাবে এই অন্ধকারকে দূর করতে পারে। এই ভিডিও শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকুন , কারণ এই ভিডিওটি আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে । আজ আমরা একটি বেদনাদায়ক কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলব সেটি হোল — “ খ্রীষ্টান নিপীড়ন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা। ” বিশ্বের কয়েক কোটি খ্রীষ্টান তাদের বিশ্বাসের জন্য কষ্ট সহ্য করছেন। কিন্তু কেন ? কারা এই নির্যাতনের পেছনে ? এবং বাইবেল আমাদের এই কষ্টের মাঝে কী শিক্ষা দেয় ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আমরা ইতিহাস , বর্তমান , এবং ঈশ্বরের বাণীর মধ্য দিয়ে যাত্রা করব । বাইবেল বলে “ ধন্য যাহারা ধার্মিকতার জন্য তাড়িত হইয়াছে , কারণ স্বর্গ-রাজ্য তাহাদেরই । ” মথি ৫ অধ্যায় : ১০ পদ । এই বাক্যটি প্রভু ...

শিথিলতা: ঈশ্বরের বাক্যের সাথে কাজের অমিল এবং ধর্মগ্রন্থ থেকে বিচ্যুত হওয়ার বিপদ। Laxity: The inconsistency of actions with the Word of God and the danger of deviating from the Scriptures.

  নমস্কার প্রিয় পাঠক বন্ধুরা , আমাদের আগের লেখা গুলোতে আমরা উল্লেখ করেছি , শিথিলতা এমন একটি আত্মিক অবস্থা যা একজন ব্যক্তির ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য এবং নৈতিকতার প্রতি দৃঢ়তার ক্ষতি করে। এটি এমন এক নিঃশব্দ বিপদ , যা আমাদের আত্মিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তবে , শিথিলতা কেবল একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয় ; এটি মণ্ডলীতেও বিরূপ প্রভাব ফেলে । বাইবেলের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় , ঈশ্বর মানব জাতিকে তাঁর বাক্য অনুসারে চলতে বহুবার সতর্ক করেছেন। উদাহরণস্বরূপ , আদম ও হবার ঘটনা টি দেখা যেতে পারে । ঈশ্বর তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন , “ সদসদ্‌-জ্ঞানদায়ক বৃক্ষের ফল খেও না।” কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় তারা সেই আদেশ লঙ্ঘন করেছিল । এর ফলাফল কী হলো ? তারা পাপের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হলো এবং ঈশ্বরের সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ক নষ্ট হলো । এই ঘটনার মতোই আমাদের জীবনে শিথিলতা আসে , যখন আমরা ঈশ্বরের বাক্যকে অগ্রাহ্য করি বা নিজেদের সুবিধামতো তার ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করি। মথি ৭ অধ্যায় : ২১ থেকে ২৩ পদে প্রভু যীশু বলেছেন , “যাহারা আমাকে হে প্রভু , হে প্রভু বলে , তাহারা সকলেই যে স্বর্গ-রাজ্যে প্রবেশ ক...

বিশ্বস্ততা বাইবেলের শিক্ষা ও মণ্ডলীর দৃষ্টান্ত | ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস, অবাধ্যতা, লোভ ও অহংকার | খ্রীষ্টীয় উপদেশ

  নমস্কার প্রিয় পাঠক বন্ধুরা, ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ততা খ্রীষ্টীয় জীবনের এক অন্যতম ভিত্তি মূল । এটি এমন এক দৃঢ় বিশ্বাস , যা ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসা এবং তাঁর নির্দেশাবলীর প্রতি আনুগত্যে প্রতিফলিত হয়। বাইবেলের বিভিন্নও জায়গায় আমরা বারবার দেখতে পাই যে, আদম ও হবার পাপের পতন থেকে শুরু করে ইস্রায়েল জাতির ভ্রমণ পর্যন্ত , ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ততার অভাবই মানবজাতির সমস্ত দুঃখ-কষ্টের মূল কারণ। বিশ্বস্ততার সংজ্ঞা বাইবেলে অত্যন্ত স্পষ্ট : “ আর বিশ্বাস প্রত্যাশিত বিষয়ের নিশ্চয়জ্ঞান , অদৃশ্য বিষয়ের প্র্রমাণপ্রাপ্তি ” ( ইব্রীয় ১১ অধ্যায় : ১ পদ ) । আদিপুস্তক ২২ অধ্যায় : ১ থেকে ১৮ পদের ঘটনাটি এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ , যেখানে আমরা দেখি কিভাবে আব্রাহাম ঈশ্বরের প্রতি অটুট বিশ্বাস প্রদর্শন করেছিলেন । এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে , ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের মাধ্যমে আব্রাহাম ঈশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন । কিন্তু আমাদের জীবনে , এবং কখনো কখনো মণ্ডলীতেও , আমরা দেখতে পাই অবাধ্যতা , ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বাস , জাগতিক প্রলোভন এবং অহংকারের মতো বিষয়গুলো ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ততার অভাব তৈরি করে। এখন প্রশ্ন হলো , মণ্ড...