‘ বাইবেলে খ্রীষ্টান ’ শব্দের অর্থ হল “ প্রভু যীশুর অনুসরণ কারী ”। রোমীয়রা এই খ্রীষ্টান শব্দটি ব্যবহার করতো মূলত প্রভু যীশু খ্রীষ্টের শিষ্যদের ঘৃণা, উপহাস বা ছোট করবার জন্য।
বাইবেল অনুসারে, খ্রীষ্টান হল সেই ব্যক্তি যিনি বিশ্বাস করেন যে, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট হলেন ঈশ্বরের একমাত্র পুত্র, যিনি মানুষকে পাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই স্বর্গ ছেড়ে এই পৃথিবীতে এসেছিলেন। আবার এও বলা যেতে পারে খ্রীষ্টান হলেন একজন ব্যক্তি যিনি প্রভু যীশু খ্রীষ্টকে তার ‘প্রভু’ এবং ‘ত্রাণকর্তা’ হিসাবে বিশ্বাস করেন। যা আমরা ( রোমীয় ১০ অধ্যায় : ৯ থেকে ১০ পদে ) দেখতে পাই। প্রভু যীশু খ্রীষ্ট হলেন খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসের ভিত্তি কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা নন। ‘ ভিত্তি ’ ও ‘ প্রতিষ্ঠাতা ’ এই দুই শব্দের সংজ্ঞার ভিত্তিতে কখনই বলা যায় না যে প্রভু যীশু একজন ‘ খ্রীষ্টান ’ ছিলেন। আমাদের এটা জেনে রাখা আবশ্যক যে, খ্রীষ্টান কোন ধর্ম নয়; খ্রীষ্টান হল একটা ‘ পথ ’। যে পথ একজন ব্যক্তিকে পবিত্রতায় জীবন যাপন করতে, সত্যের পথে চলতে, জিবন্ত ঈশ্বর কে ভয় পেতে ও একে অপরকে প্রেম করতে পথ দেখায়।
প্রভু যীশু কোন ধর্ম প্রচার করার জন্য এই পৃথিবীতে আসেননি। সমগ্র মানবজাতিকে জন্মগত ও কর্মগত পাপের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য স্বর্গ ছেড়ে তাঁর পিতা ঈশ্বরের মনোবাঞ্ছা সম্পূর্ণ করতে এই পৃথিবীতে এসেছিলেন। যা আমরা ( গালাতীয় ৪ অধ্যায় : ৪ পদে ) দেখতে পাই। এছাড়াও তিনি আমাদের শত্রু অর্থাৎ এই জগতের বর্তমান অধিপতি ‘ শয়তানকে ’ পরাজিত করতে এসেছিলেন, যার আভাষ ( আদিপুস্তক ৩ অধ্যায় : ১৫ পদে ) পাওয়া যায়। তিনি হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খুঁজতে ও তাদের উদ্ধার করতে এসেছিলেন। যা আমরা ( লূক ১৯ অধ্যায় : ১০ পদে ) দেখতে পাই। তিনি পিতা ঈশ্বর এবং সমগ্র মানবজাতির মধ্যে একটি নতুন চুক্তি স্থাপন করতে এসেছিলেন। যা আমরা ( মার্ক ১৪ অধ্যায় : ২৪ পদে ) দেখতে পাই। তিনি এসেছিলেন কারণ “ ইনি আমাদের নিমিত্তে আপনাকে প্রদান করিলেন, যেন মূল্য দিয়া আমাদিগকে সমস্ত অধর্ম হইতে মুক্ত করেন, এবং আপনার নিমিত্ত নিজস্ব প্রজাবর্গকে, সৎক্রিয়াতে উদ্যোগী প্রজাবর্গকে, শুচি করেন। ” ( তীত ২ অধ্যায় : ১৪ পদ )। খ্রীষ্টধর্ম হল প্রভু যীশু খ্রীষ্টের মাধ্যমে পরিত্রাণের পথ তাই খ্রীষ্টধর্ম এই অর্থে একটি ধর্ম নয়। অতি সহজ অর্থে ধর্ম হল, ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর মানুষের প্রচেষ্টা। কিন্তু খ্রীষ্টধর্ম শেখায় যে, ঈশ্বর ইতিমধ্যেই মানুষের কাছে এসেছেন। ঈশ্বরের পুত্র অর্থাৎ প্রভু যীশু হলেন ত্রিত্ব ঈশ্বরের দ্বিতীয় স্বত্তা, তিনি মানুষ রুপে এই পাপময় পৃথিবীতে এসেছিলেন। যা আমরা ( যোহন ১ অধ্যায় : ১৪ পদ ও ৩ অধ্যায় : ১৬ থেকে ১৮ পদে ) দেখতে পাই। যা আক্ষরিক অর্থেই ঈশ্বর আমাদের কাছে এসেছেন।
প্রভু যীশু নিজেও খ্রীষ্টান ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন একজন ইহুদি গুরু। প্রভু যীশু তাঁর মানবিক জীবদ্দশায় ঈশ্বর প্রদত্ত ইহুদি আইন অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেছিলেন। যা আমরা ( মথি ৫ অধ্যায় : ১৭ থেকে ১৮ পদে ) দেখতে পাই। বহু শতাব্দী ধরে পিতা ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি তাঁর লোকেদের উদ্ধার করতে এবং রাজত্ব করতে এক মশীহকে পাঠাবেন। প্রভু যীশুর আগমনই ছিল পিতা ঈশ্বরের সেই প্রতিশ্রুতির পরিপূর্ণতা।
প্রভু যীশু খ্রীষ্টকে খ্রীষ্টান বলা যায় না; এরই সপক্ষে অন্যতম জোরালো যুক্তি হল খ্রীষ্টান শব্দটি তাঁর পুনরুত্থান এবং স্বর্গে আরোহণের আগে পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়নি। ( প্রেরিত ১১ অধ্যায় : ২২ পদ ) অনুযায়ী খ্রীষ্টান শব্দটি ঘৃণা মিশ্রিত ভাবে প্রভু যীশু খ্রীষ্টের অনুসারীদের উদ্দেশে প্রথম ব্যবহার করা হয় আন্তিয়খিয়াতে, যা বর্তমানে সিরিয়ার অ্যান্টিওক শহর নামে পরিচিত। সব শেষে এটা বলতে কোন দ্বিধা নেই যে, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট খ্রীষ্টান ছিলেন না।




মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন